১০ জুলাই, ২০২৬ | ২৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ | ২৪ মহর্‌রম, ১৪৪৮


শিরোনাম
  ●  প্রতিক্রিয়া : ৫ না ৮—রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসলে কতজন নিহত? সংখ্যার এই বিভ্রান্তির দায় কার?   ●  লম্বরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নেতৃত্বে রমজান আলী   ●  পাতেলী খালের তীরে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ৪৭ বছর পর আবারও আলোচনায় শাহজাহান চৌধুরী   ●  মরিচ্যা বাজারের মডেল মসজিদ ও মার্কেট পরিদর্শনে ইউএনও রিফাত আসমা   ●  দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোল রক্ষক জিকুকে সংবর্ধিত করলো ক্রীড়া সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বিএসপিএ   ●  কৃষিখাতের উন্নয়নে নিরলস ভাবে কাজ করছে সরকার   ●  বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় এমপি জাফর আলম   ●  টেকনাফে প্যারাবনে আটটি বস্তায় মিলল বিদেশি৩৮৮ক্যান বিয়ার ও৭৬ বোতল মদ   ●  মানুষের কথা বলেই যাবে কক্সবাজার বার্তা   ●  টেকনাফে বিদেশী হুইস্কিসহ মাদক কারবারী আটক

প্রতিক্রিয়া : ৫ না ৮—রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসলে কতজন নিহত? সংখ্যার এই বিভ্রান্তির দায় কার?

লেখকঃ সাংবাদিক নুপা আলম

কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় এক প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বুধবার সংঘটিত এ দুর্ঘটনা ঘিরে একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমার কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে দুইটি প্রশ্নকে নিয়েই আজকের এই লেখার শিরোনাম—
১. রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘটনা পাহাড় ধস নাকি দেয়াল ধস?
২. নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কত—৩, ৫, না ৮?
এর বাইরে আমার তৃতীয় একটি প্রশ্ন রয়েছে—ঘটনাটি কখন ঘটেছিল?

মূলত সারাদিন সংবাদ সংগ্রহ, লেখা শেষে রাতে কোনো পাঠক যদি বিভ্রান্তি দূর করতে আমার মতো কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে ফোন করে, আর পুরো ঘটনার জন্য আমাদেরই দোষারোপ করেন—তখন সেটি শুধু বিব্রতকর নয়, কষ্টকরও বটে।

দিনব্যাপী এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ, বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ, প্রাপ্ত তথ্য এবং পরিবেশিত বা প্রচারিত সংবাদ—সবকিছু মিলিয়ে আমার মধ্যেও রয়েছে চরম বিভ্রান্তি। যেখানে পাঠক বা দর্শক বিভ্রান্ত হবেন—এটাই স্বাভাবিক। বরং বলা যায়, এই বিভ্রান্তির জন্মই হয়েছে দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর পরস্পরবিরোধী তথ্য থেকে।

অথচ দিনভর ঘটনার কোনো তথ্যই একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমি নিজ থেকে বলিনি বা লিখিনি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেই সব তথ্য পরিবেশন করেছি। কিন্তু দিন শেষে দোষ এসে পড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর—এটাই বাস্তবতা।

ঘটনার শুরু বুধবার বেলা ৩টার আগ মুহূর্তে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ভারী বৃষ্টির কারণে ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসার পাশে পাহাড় ধস হয়েছে। পাহাড়ের মাটি চাপা পড়েছে মাদ্রাসাটিতে। এতে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা করা হয়।

খুব স্বাভাবিকভাবে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি জানান—মাদ্রাসাটি পাহাড় ধসে চাপা পড়েছে। নিহত ৫ জন, জীবিত উদ্ধার ২ জন।

এই তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন শুরু হয়। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়—নিহত ৩ জন, জীবিত উদ্ধার ৪ জন। একই ঘটনার দুইটি সংখ্যা—৩ এবং ৫। এখান থেকেই শুরু বিভ্রান্তি।

পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিস সন্ধ্যার দিকে জানায়—নিহত ৮ জন, আহত ১৩ জন। এর কিছুক্ষণ পর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় থেকেও নিহত ৮ জন বলা হয়। কিন্তু রাত ৯টার দিকে এসে আবার সেই একই সূত্র এবং এপিবিএন থেকে জানানো হয়—নিহত ৫ জন।

তাহলে প্রশ্নটি আবার সামনে আসে— ৫ না ৮—আসলে কতজন নিহত? একই দিনে, একই ঘটনায়, একই দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে চারটি ভিন্ন সংখ্যা—এটি কি শুধুই বিভ্রান্তি, নাকি দায়িত্বহীনতা?

প্রতিটি সংখ্যা একটি জীবন। একটি পরিবার। সেই সংখ্যাকে যদি বারবার পরিবর্তন করা হয়, তাহলে সেটি শুধু তথ্যগত ভুল নয়—এটি একটি মানবিক সংকটের অবমূল্যায়ন।

দ্বিতীয় প্রশ্ন—ঘটনাটি পাহাড় ধস নাকি দেয়াল ধস?

ঘটনার শুরুতে এটি পাহাড় ধস হিসেবে জানানো হলেও এপিবিএন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লিখিতভাবে জানিয়ে যাচ্ছে—এটি দেয়াল ধস।

দুটি বর্ণনা, দুটি বাস্তবতা। যদি এটি পাহাড় ধস হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এমন স্থাপনা? আর যদি এটি দেয়াল ধস হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন একটি মাদ্রাসার দেয়াল এত দুর্বল? অর্থাৎ, ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দায় নির্ধারণের প্রশ্ন।

তৃতীয় প্রশ্ন—ঘটনাটি কখন ঘটেছিল? প্রাথমিকভাবে বলা হয়, বেলা আড়াইটা থেকে পৌনে তিনটার মধ্যে। কিন্তু এই সময়টিও সব সূত্রে একভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। সময় নিয়ে এই অস্পষ্টতা উদ্ধার তৎপরতার মূল্যায়নকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

একজন মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিক হিসেবে সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই—যখন তথ্যের উৎসগুলোই একেক সময় একেক কথা বলে। তখন সাংবাদিক বিভ্রান্ত হন, আর সেই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মধ্যে।

কিন্তু দিন শেষে প্রশ্ন আসে সাংবাদিকদের দিকে—“আপনারা সঠিক তথ্য দেন না কেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ বাস্তবতা হলো—গণমাধ্যম অনেক সময় ভুল তথ্য তৈরি করে না; বরং ভুল তথ্যের বাহক হয়ে ওঠে, যা আসে দায়িত্বশীল সূত্র থেকেই।

এই ঘটনাটি আমাদের একটি বড় সত্য সামনে এনে দিয়েছে—আমাদের তথ্য ব্যবস্থায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য, একক তথ্যসূত্র না থাকলে এমন বিভ্রান্তি ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।

প্রশ্ন রয়ে যায়—এই দায় কার?

যে কর্মকর্তা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন? যে প্রতিষ্ঠান যাচাই ছাড়া তথ্য দিয়েছে? নাকি সেই গণমাধ্যমকর্মী, যিনি সেই তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন?

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এই ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের তথ্য ব্যবস্থার একটি আয়না। যেখানে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—সত্যের চেয়ে বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়ায়, আর সেই বিভ্রান্তির বোঝা শেষ পর্যন্ত বইতে হয় গণমাধ্যমকর্মীদেরই।

শেষ পর্যন্ত আবার সেই প্রশ্ন-৫ না ৮—সংখ্যাটা আসলে কত? নাকি আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সত্য নিজেই অনিশ্চিত?

আবারও বলি প্রতিটি সংখ্যা একটি মানুষ। একটি জীবন। একটি পরিবার। সেই সংখ্যাকে যদি আমরা এভাবে বদলে ফেলতে পারি, তাহলে বুঝতে হবে—আমাদের কাছে মৃত্যু আর বাস্তবতা নয়, এটি একটি পরিসংখ্যান মাত্র। এই বিভ্রান্তি শুধু তথ্যগত ভুল নয়—এটি একটি গভীর দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন। কারণ একটি রাষ্ট্র যখন একটি দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের সঠিক সংখ্যা জানাতে পারে না, তখন সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিক সংবেদনশীলতারও চরম অবনতি।

লেখক : নুপা আলম, গণমাধ্যমকর্মী, কক্সবাজার।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।