২৬ জুন, ২০২৬ | ১২ আষাঢ়, ১৪৩৩ | ১০ মহর্‌রম, ১৪৪৮


শিরোনাম
  ●  লম্বরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নেতৃত্বে রমজান আলী   ●  পাতেলী খালের তীরে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ৪৭ বছর পর আবারও আলোচনায় শাহজাহান চৌধুরী   ●  মরিচ্যা বাজারের মডেল মসজিদ ও মার্কেট পরিদর্শনে ইউএনও রিফাত আসমা   ●  দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোল রক্ষক জিকুকে সংবর্ধিত করলো ক্রীড়া সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বিএসপিএ   ●  কৃষিখাতের উন্নয়নে নিরলস ভাবে কাজ করছে সরকার   ●  বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় এমপি জাফর আলম   ●  টেকনাফে প্যারাবনে আটটি বস্তায় মিলল বিদেশি৩৮৮ক্যান বিয়ার ও৭৬ বোতল মদ   ●  মানুষের কথা বলেই যাবে কক্সবাজার বার্তা   ●  টেকনাফে বিদেশী হুইস্কিসহ মাদক কারবারী আটক   ●  নজিবুল ইসলামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি : গ্রামীণ জনপদের মানুষের মুখে হাসি

গোমাতলীতে ঈদ আনন্দ নেই!


কক্সবাজার সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের গোমাতলী গ্রাম। গোমাতলী গ্রামটি সদর উপজেলার মানচিত্রে থাকলেও আর দৃশ্যমান নেই। গত ১৫ মাসের জোয়ার ভাটায় বিলিন হয়েছে এলাকার ২শ বসতভিটা, বাড়িঘর, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্টান। এছাড়া ফুলছড়ি নদীতে বিলীনের পথে রাজঘাট মসজিদ-কবরস্থান। সকালে যেখানে রান্না করে খাইলাম, দুপুরে জোয়ারের পানিতে বন্দি। বসতভিটায় চলছে এখন জোয়ার ভাটা। কথাগুলো বলছিলেন ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড উত্তর গোমাতলী চরপাড়ার বাসিন্দা আমির হোছন (৪৮)।
আমির হোছনের বাড়ি আগে ছিল চরপাড়ায়। পাড়াটি জোয়ারের পানিতে বিলীন হওয়ার পর তিনি চকরিয়া উপজেলার খুটাখালীতে গিয়ে বাড়ি করেন। এভাবেই ৬নং স্লুইস গেইটের ভাঙন দিয়ে লুনা পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে বৃহত্তর গোমাতলীর ১০টি গ্রাম। তবে ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারকে (পাউবো) দোষারুপ করছেন স্থানীয়রা।
সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭,৮ও ৯নং ওয়ার্ডে গোমাতলী গ্রাম। ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার মাহমুদুল হক দুখু মিয়া জানান, গেল পরিষদ নির্বাচনের সময় এ ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯শজন। এই ভোটারের মধ্যেও বেশির ভাগ থাকেন জেলা ও উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায়। গত ২১ মে রোয়ানু জলোচ্ছাসে দুখু মিয়ার বাড়িটিও রক্ষা হয়নি। এদিকে, গত ১৫ মাসে গোমাতলী গ্রামের ২০০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এছাড়া রাজঘাট, চরপাড়া,ছিদ্দিক বাপের পাড়া,বাশঁখালী পাড়ার প্রায় ১৫০ পরিবার নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
মাহমুদুল হক দুখু মিয়া বলেন, অনেক পরিবার একাধিকবার পর্যন্ত বাড়িঘর সরিয়েও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শেষ রক্ষা পায়নি। তবুও পাউবো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভাঙনরোধে এই এলাকায় এক ইঞ্চি কাজও করা হয়নি।
গোমাতলী মোহাজের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়ুব আলী বলেন, গত ২১ মে রোয়ানুতে বিদ্যালয়টি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। এরপর রাজঘাট-গাইট্যখালী ফোরকানিয়া মাদরাসায় ক্লাস নেয়া হচ্ছে। জোয়ারের সময় শ্রেণিকক্ষেও পানি উঠছে। ভাঙন প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই স্কুলের কার্যক্রম বন্দ রাখতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়েল শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩শ জন। অথচ ১ বছর আগেও ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল।
৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলা উদ্দীন বলেন, এ এলাকায় বন্যা নেই। তবে পাউবো বেড়িবাঁধ ভাঙনের কারণে শত শত মানুষকে যেখানে-সেখানে থাকতে হচ্ছে। বেড়িবাঁধ বিলীন হওয়ার পর গ্রামের পর গ্রাম বিলিন হয়ে সবাই সর্বহারা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোমাতলীতে কয়েক শতাধিক বাড়ির অর্ধেকের বেশিতে চলছে জোয়ার ভাটা। ফাঁকা জায়গায় পড়ে আছে ভাঙাচেরা আসবাবপত্রসহ গাছপালা। রান্নাঘরে চুলায় হাঁটু পানি। এসব বাড়ির গৃহকর্ত্রীরা বলেন, চুরি করে নিলেও ঘরবাড়ি থাকে, আগুনে পুড়লেও ভিটেমাটি থাকে, কিন্তু জোয়ারের পানিতে ভেঙে সব লন্ডভন্ড হয়েছে। ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা আরো বলেন, বেড়িবাঁধ ভাঙনে বাড়িঘর হারানোর ভয় ও চিন্তায় ভানবাসী এসব মানুষের গত রমজানের ঈদে কেটেছে নিরানন্দে।
স্থানীয়রা বলেন, বেড়িবাঁধ ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে পরিবার নিয়ে রোদ-বৃষ্টিতে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি। আমরা কিছু চাই না সরকার আমাদের বেড়িবাঁধ ভাঙন ঠেকিয়ে দিক, একটু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে দিক।
ইউনিয়নের বদরখালী পাড়ার মো:হোছন বলেন, বেড়িবাঁধ ভাঙনে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার আমাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। এখন পরের বাড়ি থাকি, দৈনিক কাজ করি।
ছিদ্দিক বাপের পাড়ার আলী আহমদ বলেন, আমার বাড়িতে কয়েকবার জোয়ারের লুনা পানি ঢুকেছে। মসজিদ পর্যন্ত পানিতে ঢুবে গেছে। এবার এলাকাবাসীর মনে ঈদ আনন্দ নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটা গ্রাম জোয়ারের পানিতে ভাসছে অথচ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি আরো বলেন, বেড়িবাঁধ ভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা সব হারিয়ে গোমাতলী গ্রামের শত শত মানুষ এখন ফকিরের মতো। বেশির ভাগ মানুষ এখন শ্রম বিক্রি করে খায়। দেড় বছর ধরে ভাঙলেও কেউ কোনো কাজ করেনি।
রাজঘাট পাড়ার বাসিন্দা জাফর আলম বলেন, কয়েকবার বাড়িঘর সরানো হয়েছে। খুব অসহায় অবস্থায় আছি। এছাড়া মসজিদ ও কবরস্থান ফুলছড়ি নদীগর্ভে বিলিন হওয়ার পথে। সরকারের কাছে আমাদের-একটাই দাবি, পাথর দিয়ে বেড়িবাঁধটা যেন বেঁধে দেয়।
চরপাড়া গ্রামের মো: হোসন ফকির বলেন, জোয়ারের পানিতে সব হারিয়ে এখন পরের জায়গা বসবাস করি। গত ৩ মাস ধরে বেড়িবাঁধের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, পাশাপাশি এ এলাকার মানুষকে পুনর্বাসন এবং আর্থিক- খাদ্য সহযোগিতাও করা হয়নি।
গোমাতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেড়িবাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার কয়েকটি পরিবার তাদের টিনের ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ খুলছেন চালা, কেউ বেড়া, কেউবা ঘর থেকে বের করছেন আসবাবপত্র। এছাড়া বিভিন্ন আকারের গাছ কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন।
ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য জানান, পূর্ব গোমাতলী থেকে পশ্চিম গোমাতলী পর্যন্ত সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে চলছে জোয়ার ভাটা। এ পরিস্থিতিতে নিদারুণ কষ্ট ও ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করছে সবাই।
পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ বলেন, আমার নির্বাচিত এলাকার মধ্যে গোমাতলী গ্রাম মানচিত্রে থাকলেও দৃশ্যমান নেই। এখানে কোনো জনবসতি থাকার মতো অবস্থা নেই। পাউবো বেড়িবাঁধ ভাঙনে সব শেষ হয়ে গেছে। ভাঙন রোধে দ্রুত কাজ না করলে গোমাতলীর ১০ গ্রাম-পাড়া মহল্লা বিলীন হয়ে যেতে পারে। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী এ এলাকায় অসহায় মানুষের দুর্দশার কথা বিবেচনা করে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিবেন।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গোমাতলীর বেড়িবাঁধ ভাঙন কবলিত অংশ পরিদর্শন করেছি। ওই এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে ভাঙন প্রতিরোধে বরাদ্ব দেয়া হয়েছে। আশাকরি ঈদের পরেই কাজ শুরু করা হবে।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।