
নিজস্ব প্রতিবেদক,উখিয়াঃ
শ্মশানের সীমানা প্রাচীর ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উখিয়ায় সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী দারোগা বাজার কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের ভাঙচুর করা দেয়াল পুনর্নির্মাণ এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে শ্মশান ও দুর্গা মন্দির পরিচালনা পরিষদ। দাবি পূরণে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংগঠনটি ঘোষণা করেছে, ৮ অক্টোবরের মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না হলে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন থেকে বিরত থাকবে তারা।
রোববার (৪ অক্টোবর) উখিয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দারোগা বাজার কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে দুই শত বছরেরও বেশি সময় ধরে উখিয়ার সনাতনী সম্প্রদায়ের মরদেহ সৎকার হয়ে আসছে। তাদের দাবি, শ্মশানের জমি সরকারি খাস জমি হিসেবে আরএস ও বিএস ১ নম্বর খতিয়ানে শ্মশানের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।
আয়োজকদের ভাষ্য, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজন জানতে পারেন, শ্মশানের দক্ষিণ পাশের পূর্ব-পশ্চিমমুখী সীমানা প্রাচীরের মধ্যবর্তী অংশের ১৫ ফুটের বেশি দেয়াল রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তাদের অভিযোগ, শ্মশানের জায়গা জবরদখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ওই প্রাচীর ভাঙচুর করা হয়েছে।
দেয়াল ভাঙার ঘটনায় শ্মশান ও সংলগ্ন দুর্গা মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বিশেষ করে সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা হওয়ায় মন্দিরে প্রতিমা তৈরি ও পূজার প্রস্তুতিতে থাকা লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন আয়োজকেরা।
ঘটনার পর বিষয়টি উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়। সংগঠনটির দাবি, ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে থানায় এবং ইউএনও কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, পরবর্তী সময়ে থানায় ডেকে নেওয়া হলে কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে সাহাব উদ্দিন (৬৫), মোসলেম উদ্দিন (৫৫), টুনু (৫২), তারেকুল ইসলাম রিফাত (২৫) ও জাহেদুর রহমান (২২)সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে দেয়াল ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগঠনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। আয়োজকদের অভিযোগ, কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার, অপবাদ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
আয়োজকেরা বলেন, ‘বিষয়টি শুধু একটি দেয়াল ভাঙার ঘটনা নয়, এর সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী সৎকারস্থল ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।’ তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ভাঙচুর করা সীমানা প্রাচীর দ্রুত পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তারা।
দাবি আদায়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে তিন দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর প্রথম ধাপে ৫ অক্টোবর উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ৮ অক্টোবরের মধ্যে সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ ও ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না হলে দারোগা বাজার পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে আসন্ন দুর্গাপূজা উদযাপন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এরপরও দাবি পূরণ না হলে ১০ অক্টোবর উখিয়া স্টেশনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে। ওই সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তবে আয়োজকেরা সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার পথে না গিয়ে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান বলে জানান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেয়াল পুনর্নির্মাণ ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে চান তারা। এ জন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও কামনা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের উপদেষ্টা মাস্টার মুকুন্দ প্রসাদ রুদ্র, সভাপতি মৃদুল আইচ ও সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রতন কান্তি দে ছাড়াও কার্যনির্বাহী সদস্য এডভোকেট রবীন্দ্র দাশ রবি, দীপক মল্লিক, কাজল কুমার সেন, সহসভাপতি রতন দেওয়ানজী, প্রধান পুরোহিত হারাধন চক্রবর্তী, সদর দারোগা বাজার পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উৎপল বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক কাজল বিশ্বাস, বাদল কর, মাস্টার সঞ্জয় দে শুভ উপস্থিত ছিলেন।







