৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ২৬ মাঘ, ১৪২৯ | ১৭ রজব, ১৪৪৪


শিরোনাম
  ●  চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, এমপি মোসলেম উদ্দীনের মৃত্যুতে কক্সবাজার জেলা আ’লীগের শোক   ●  স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাত এমপি জাফর আলমের   ●  কক্সবাজার সদর হাসপাতালে হয়রানি ও হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন   ●  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানোন্নয়নে কক্সবাজার পৌর এলাকায় চলছে দরিদ্রবান্ধব নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কাজ   ●  পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে নিষিদ্ধ পলিথিন, হাইড্রোলিক হর্ণ জব্দ, জরিমানা   ●  বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদের নেতা   ●  হাতের কব্জির রগ কেটে মোবাইল-ল্যাপটপ ছিনতাই   ●  কক্সবাজারে ইয়াবার মামলায় ৮ রোহিঙ্গার যাবজ্জীবন   ●  লোহাগাড়ায় পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে ‘পেট্রোলের আগুনে’ পুড়িয়ে মারার চেষ্টা!   ●  চকরিয়ার সাহারবিলে সড়ক উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন করলেন এমপি জাফর আলম

শূন্যতা পূরণ হচ্ছে না ২০ দলীয় জোটে

শূন্যতা পূরণ হচ্ছে না ২০ দলীয় জোটে

অভিজ্ঞ সংগঠক, পোড় খাওয়া ও প্রাজ্ঞ-কৌশলী নেতার অভাব বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে। ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার প্রভাব পড়ছে। জোটের কোনো কোনো নেতা দল ছেড়ে ভিন্ন দল গড়েছেন, কেউ মারা গেছেন, কেউ রয়েছেন আত্মগোপনে কিংবা নিষ্ক্রিয়। আবার কেউ দীর্ঘদিন কারাবন্দী। ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না জোটটি।

গত ৩ জানুয়ারি থেকে দুই মাসের বেশী সময় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সারাদেশে পালিত হচ্ছে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল কর্মসূচি। চলমান আন্দোলন দমাতে সরকারও হার্ডলাইনে। এ অবস্থায় সামনে উঠে এসেছে বিএনপি ও ২০ দলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের অভাবের কথা। খালেদা জিয়ার পাশে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব না থাকায় বিএনপি জোটের আন্দোলন সফল হচ্ছে না বলে মনে করেন কেউ কেউ।

এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ নেতাদের কেউ কেউ জোটের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকলেও সরকারের কঠোর অবস্থান ও হামলা-মামলার কারণে তারা আত্মগোপনে থাকছেন। অন্যদিকে অতীতে যে কোনো আন্দোলনে দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডাইন্যামিক নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে চলে আসায় তাদের অবর্তমানে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে মাঠের রাজনীতি।

বিশেষ করে বিএনপির যে কোনো আন্দোলনে ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিক দলসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনে ২০০১ সালের পর থেকে যোগ্য ও ডাইন্যামিক নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। জোটের দ্বিতীয় শরিক জামায়াতের পাশাপাশি ক্রান্তিকাল চলছে ছাত্রশিবিরেও।

১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা ছিলেন সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তারা বসে যে সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেন তা বাস্তবায়ন করত ছাত্রদল, যুবদলসহ অন্য সহযোগী সংগঠনগুলো। জামায়াতের পাশাপাশি ছাত্রিশিবিরের অবস্থানও ছিল শক্ত।

কিন্তু আগের সেই অবস্থান নেই বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলের নীতিনির্ধারকদের। তেমনি ২০ দলের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে যে সব সিদ্ধান্ত আসে তা সঠিকভাবে তামিল করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংগঠনগুলো। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্যও অর্জিত হচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভগের চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সত্য কথা বলতে কী, এখন যারা বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটিতে আছেন তাদের ৩-৪ জন ছাড়া কেউই বিএনপির মতো এতবড় একটি দলের ওই পদে থাকার যোগ্য নন। তাও আবার যারা আছেন তারা শারীরিকভাবে অসুস্থ। যারা আছেন, তাদের অনেকেরই তাত্ত্বিক জ্ঞান নেই, অনেকেই আবার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় দুর্নীতি করে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। ফলে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ নিজেদের বাঁচানোর জন্য সরকার বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচার করে দেন। আঁতাত করে চলে।’

তিনি বলেন, ‘আগে যারা বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ছিলেন তারা তো এভাবে অবৈধভাবে অর্থবিত্তের মালিক হননি। তাই তারা সব সময় স্বাধীন সত্ত্বা দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দল পরিচালনায় বেগম খালেদা জিয়াকে সহযোগিতা করতেন। পরবর্তী সময়ে তরুণদের আধিপত্যের কারণে বিএনপিতে সংঘাতটা শুরু হল। তরুণ নেতারা প্রবীণ নেতাদের যথাযথ সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

অধ্যাপক বেপারী আরও বলেন, ‘৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর আন্দোলন গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল। বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটি এ ব্যাপারে সঠিক কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। এ দায় স্ট্যান্ডিং কমিটির।’

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আগে দুই নেত্রী অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। আমার ধারণা, তারা এখন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন অথবা পরিবারের সদস্যরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এখন সব ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।’

অভিজ্ঞ নেতারা তাদের পাশে না থাকার কারণেই এ সব হয় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হয়তোবা এ বক্তব্যের কিছুটা সত্যতা আছে। তবে এখনো তো অনেক সিনিয়র নেতা আছেন, অনেকেরই অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তারা অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমার মনে হয়, প্রধান দুই দলে একনায়কতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আগে দুই নেত্রী অনভিজ্ঞ ছিলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকত। এখন তারা নিজেদের অভিজ্ঞ মনে করেন, তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে গেছে। তাই তারাই একক সিদ্ধান্ত নেন।’

১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সফল আন্দোলনের মাধ্যমে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ১৯৯৯ সালে বিএনপি, এরশাদের জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক-মুফতী আমিনীর নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে গঠিত হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। যদিও কিছুদিন পরেই এরশাদের জাতীয় পার্টি চারদলীয় জোট ছেড়ে চলে যায়। তবে নাজিউর রহমান মঞ্জু ও অধ্যাপক ডা. আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন জাপার একটি অংশ জোটে থেকে যায়।

সূত্র জানায়, চারদলীয় এ জোট গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন মরহুম সাংবাদিক নেতা আনোয়ার জাহিদ। যারা অতীতে নারীর নেতৃত্ব হারাম বলে ফতোয়া দিয়ে আসছিলেন সেই ইসলামপন্থীদের নানাভাবে ম্যানেজ করে খালেদার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠন করেন। ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয় এবং ক্ষমতায় আসে চারদলীয় জোট। কিন্তু ২০০১ সালে জোট সরকার গঠনের কিছুদিনের মাথায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ থেকে আনোয়ার জাহিদকে বহিষ্কার করা হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বিএনপির তখনকার স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের (বর্তমানে এলডিপি সভাপতি)। চারদলীয় জোট সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় বদরুদ্দোজা চৌধুরী কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী নেতাকে নিয়ে বিএনপি ছাড়েন। গঠন করেন বিকল্পধারা বাংলাদেশ।

ক্ষমতার শেষদিকে দলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা অলি আহমদও জামায়াতসহ অভ্যন্তরীণ অন্য ইস্যুতে বিএনপি ছেড়ে গঠন করেন এলডিপি। তার সঙ্গে বিএনপির বেশকিছু মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যও চলে যান।

এর পর ১/১১ তে সংস্কারপন্থী ইস্যুতে বিএনপির তখনকার মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, যুগ্ম-মহাসচিব আশরাফ হোসেনসহ বেশকিছু নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। ছেলের দোষে দোষী সাব্যস্ত বিবেচনায় বহিষ্কৃত হন তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী। এরই মধ্যে মারা যান খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, আব্দুস সালাম তালুকদার, আব্দুল মতিন চৌধুরী, কে এম ওবায়দুর রহমান, এ্যাডভোকেট মাহবুব উদ্দিন, মির্জা গোলাম হাফিজের মতো প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ নেতারা। সর্বশেষ মারা যান ১/১১ সময় দলের ক্রান্তিকালে নেতৃত্বদানকারী খন্দকার দেলোয়ার হোসেন।

অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী (মৃত), কুমিল্লার কর্নেল (অব.) এম আকবর (মৃত), খুলনার শেখ রাজ্জাক আলী (সাবেক স্পিকার, বর্তমানে বহিষ্কৃত), রাজশাহীর সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক (নিষ্ক্রিয়), ভোলার সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন শাহজাহান (মৃত), বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ছেলে রংপুরের শফিকুল গণি স্বপনের (মৃত) মতো নেতারাও আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মূলত এ সব নেতা ছায়ার মতো থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। রাজনীতিতে সঙ্কট তৈরি হলেই সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছেছেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সঙ্কট মোকাবেলা করেছেন। ধারাবাহিকভাবে দলকে শক্তিশালী করে তিনবার ক্ষমতায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

২০০৯ সালের কাউন্সিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ অন্যান্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী এ ফোরামে মোট সদস্য রাখা হয় ১৮ জনকে। তাদের মধ্যে পুরনো অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ড. আর এ গণি, এম শামসুল ইসলাম, বেগম সারোয়ার-ই রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকার, তরিকুল ইসলাম থাকলেও তারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ বা শারীরিকভাবে অসুস্থ। এর বাইরে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম কারাগারে রয়েছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ার বর্তমানে সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। অন্য নেতারা যেমন- আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খানের মধ্যে কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। আবার কারও কারও বিরুদ্ধে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদের ‘তকমা’ও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতে বিএনপির প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে বেগম খালেদা জিয়া যে সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেন তা বাস্তবায়ন করত দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিক দল, কৃষক দলসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠন। কিন্তু এ সব সহযোগী সংগঠনের নেতারা এখন বিএনপির চালিকাশক্তিতে আসীন হলেও তাদের স্ব স্ব পদে ও দলে ডাইন্যামিক নেতৃত্বের অভাব বহুদিনের।

অতীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে সারাদেশের শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে আন্দোলন বেগবান করেছেন দীর্ঘদিন শ্রমিক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী নজরুল ইসলাম খান। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তার আগের পদে যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং যারা শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে রয়েছেন তাদের আগের মতো ভূমিকা নেই।

যুবসমাজকে নিয়ে ৮০ ও ৯০ দশকের পুরো সময়ে যুবদলের সভাপতির দায়িত্বে থাকা মির্জা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (কারাগারে) বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তারা এক সময় ঢাকাসহ সারাদেশে স্বৈরাচার এরশাদ ও আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরালো করেছিলেন। কিন্তু তাদের প্রথমে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব এবং বর্তমানে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে নিয়ে আসা হলেও তাদের স্থলে যুবদলে কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি।

অন্যদিকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে (৯৬-২০০১) আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে নিয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন একদল মেধাবী ডাইন্যামিক সাহসী ছাত্রনেতা। ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেন আমানউল্লাহ আমান (বর্তমানে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব), খায়রুল কবির খোকন (শিক্ষা সম্পাদক), রুহুল কবির রিজভী আহমেদ (যুগ্ম-মহাসচিব), ইলিয়াস আলী (দীর্ঘদিন নিখোঁজ, সাংগঠনিক সম্পাদক), নাজিম উদ্দিন আলম (আন্তর্জাতিক সম্পাদক), ফজলুল হক মিলন (কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা সভাপতি), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী (ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক), হাবিব-উন-নবী খান সোহেল (ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি) এবং নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু (দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে)।

এ সব সাবেক ছাত্রনেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পদে আসীন হলেও বর্তমানে বিএনপির অন্যতম ভ্যানগার্ড ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থা নড়বড়েই বলা চলে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলেও নানা কারণে ছাত্রদলে যোগ্য ও ডাইন্যামিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি।

এদিকে ১৯৯৬-২০০১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা চারদলীয় জোট বর্তমানে ২০ দলে রূপ নিলেও আগের মতো অবস্থান নেই শরিক দলগুলোর। এর মধ্যে জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তর শরিক জামায়াতে ইসলামীর অভিজ্ঞ নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন সাজায় কারাগারে রয়েছেন।

দলটির অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর রয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের তৎকালীন নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীদের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিতর্কিত ভূমিকা পালনের অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক ময়দানে ছিলেন প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ। বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে ধর্মভীরু মুসলমানদের আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় করতেন বলে জানা যায়। কিন্তু তাদের অবর্তমানে দলটিতে বর্তমানে দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি চতুর্থ ক্যাটাগরির নেতারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক মাঠে সরাসরি ভূমিকা রাখার অভিজ্ঞতা থাকলেও তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুরনোদের মতো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এ ছাড়া শীর্ষ নেতাদের মুক্তি ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ ৬ বছরে দলটি রাজনৈতিকভাবে অনেকটা চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় চলমান আন্দোলনে আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এদিকে চারদলীয় জোটের অন্য শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক ও মুফতী আমিনী মৃত্যুবরণ করেছেন। জাপার (নাজিউর) নাজিউর রহমান মঞ্জু ও অধ্যাপক আব্দুল মতিনও মারা গেছেন। তারা ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ। তাদের অভাব পূরণ করতে পারছেন না দল দুটির বর্তমান নেতৃত্ব। এ ছাড়া শরিক দলের ২-৩ জন ছাড়া অধিকাংশই রাজনীতিতে নতুন।

বিএনপি আগের যে কোনো মুহূর্তের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এ তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে.(অব.) মাহবুবুর রহমান। দ্য রিপোর্টকে তিনি বলেন, দলের অবস্থা আগের মতোই(শক্তিশালী) আছে। আন্দোলন তো চলছে। ঢাকায় হয়তো একটু কম দৃশ্যমান হচ্ছে কিন্তু ঢাকার বাইরে তো নেতাকর্মীরা মাঠেই আছে।

ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থা আগের চেয়ে দুর্বল কিনা- জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেনে, আন্দোলন দমাতে সরকার বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে। হামলা-মামলা চালাচ্ছে। নেতাকর্মীরা তো বিভিন্নভাবে জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছে। সুতরাং তারা মাঠে নেই বা দুর্বল এটা বলা যাবে না।

১৯৯৬-২০০১ সালের তৎকালীন আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ইসলামী ঐক্যজোট সাংগঠনিকভাবে দুর্বল কিনা- জানতে চাইলে দলটির চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল নয়, আগের মতোই আছে। তবে ওই সময়ের পরিবেশ পরিস্থিতি আর এখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি এক নয়। তখন কমপক্ষে সভা-সমাবেশ করা যেত, রাস্তায় নামা যেত। এখন তো তাও দেওয়া (সুযোগ) হয় না।

এ ব্যাপারে জামায়াতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই শীর্ষ নেতাদের অভাব বোধ করি। তারা সবদিক দিয়েই অভিজ্ঞ ছিলেন। এখন আন্দোলনের মাঠে যাদের ভূমিকা রাখার কথা ছিল কিংবা জেলা বা মহানগরের রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার কথা ছিল, তাদেরই কেন্দ্র নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। দলে একটা সঙ্কট ছিল, তবে ধীরে ধীরে এ সঙ্কট কেটে যাচ্ছে।’

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।