২০ জুন, ২০২৪ | ৬ আষাঢ়, ১৪৩১ | ১৩ জিলহজ, ১৪৪৫


শিরোনাম
  ●  পাহাড় ধ্বসঃ ৮ রোহিঙ্গাসহ নিহত ১০   ●  উখিয়ার ক্যাম্পে পৃথক পাহাড় ধ্বসে ৭ রোহিঙ্গা সহ নিহত ৯   ●  রামুতে ঘুমন্ত স্বামী-স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা   ●  উখিয়া-টেকনাফের ৫ শতাধিক তরুন-তরুণীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ‘সুশীলন’   ●  খাদ্যে ভেজাল রোধে সামাজিক আন্দোলন দরকার : খাদ্যমন্ত্রী   ●  ইজিবাইকের ছাদে তুলে ৮ বছরের শিশু নির্যাতন ভিডিও ভাইরাল: তিন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার   ●  ভবিষ্যতে প্রেস কাউন্সিলের সার্টিফিকেট ছাড়া সাংবাদিকতা করা যাবে না   ●  একমাসেও অধরা ঘাতক চক্র, চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের অগ্রগতি নিয়ে পরিবারে হতাশ   ●  সমুদ্রকেই ঘিরে কক্সবাজারের অর্থনীতি   ●  সামাজিক কাজে বিশেষ অবদানের জন্য হাসিঘর ফাউন্ডেশনকে সম্মাননা স্মারক প্রদান

মানব পাচারে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা জড়িত

283A696A00000578-0-image-a-41_1430574201933

 আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তাঁদের স্বজনরা জড়িত থাকার কারণেই আদম ব্যবসার ছদ্মাবরণে মানব পাচারকারী ‘দাস ব্যবসায়ীদের’ আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের অনুসন্ধানে মানবপাচারকারী এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীদের নাম-ঠিকানা উঠে এলেও অপরাধীদের ধরা হচ্ছে না।

এরই মধ্যে অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টার সময় সমুদ্রপথে অনেক তরুণের স্বপ্নের সলিলসমাধি হচ্ছে। আবার থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরেও বাংলাদেশি তরুণ-যুবকদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর আসছে। এসব খবর বিশ্বমিডিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার সোনাপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ ইসহাককে প্রায় এক বছর আগে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচার করেন ওই এলাকার প্রভাবশালী মো. আবদুল্লাহ্। এরপর থেকে ইসহাকের কোনো হদিস নেই। ইসহাকের স্ত্রী শাহনাজ বেগম শানু (৩০) বলেন, আবদুল্লাহ সমুদ্রপথে তাঁর স্বামীকে মালয়েশিয়া পাঠানোর নাম করে ট্রলারে উঠিয়ে দেয়। প্রায় এক বছর ধরে তাঁর কোনো খোঁজ নেই। এরপর ইসহাক থাইল্যান্ডে আছে, কয়েকদিনের মধ্যেই মালয়েশিয়া প্রবেশ করবে ইত্যাদি কথা বলে শানুর কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা নিয়েছে আবদুল্লাহ। কিন্তু এখনো ইসহাকের হদিস নেই। শানু বলেন, আবদুল্লাহ ক্ষমতাসীন দলের লোক। বড় বড় নেতার সঙ্গে নাকি তার চলাফেরা। কিছুদিন এলাকায় থাকে, আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের নাগাল পায় কে? এই কারণে শানু আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়ন থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিলেন ১০ থেকে ১২ জন লোক। গত এক বছরেও তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তাদেরকে যারা পাঠিয়েছিল সেই দালালরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের নাম প্রকাশ করতে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য তো বটেই, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুর রহমানও রাজি হননি। চেয়ারম্যান বলেন, ‘খুটাখালীর ১০-১২ জন লোক প্রায় এক বছর ধরে নিখোঁজ আছেন। তাঁরা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রভাবশালী লোকজন জড়িত বলে শুনেছি। কিন্তু আমি কারো নাম বলতে চাই না।’

পুলিশের অনুসন্ধান কমিটির তালিকায় দেখা গেছে, মানব পাচারকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগের বাড়ি কক্সবাজার জেলায়। তাদের কেউ কেউ অতীতে গ্রেপ্তার হলেও আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবার আগের পেশায় ফিরে গেছে এবং অনেকে গ্রেপ্তার না হয়ে এলাকায় অবস্থান করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমুদ্রপথে মানবপাচার রোধকল্পে করণীয় এবং মানবপাচারের আদ্যপান্ত অনুসন্ধান করতে গত বছরের ১৮ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি এই বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করে। একাধিক দফা সময় বাড়িয়ে ওই কমিটি গত ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদনটি দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে পাচারকারী চক্রের রহস্য উন্মোচন করে তালিকাভুক্তদের আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর মানবপাচার রোধসংক্রান্ত আন্তমন্ত্রণালয়/আন্তসংস্থা কমিটির ৭৮তম সভার আলোচনা শেষে ৯টি সুপারিশ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে মানবপাচার রোধকল্পে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ দেওয়ার ছয় মাস এবং পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কমিটির আট দফা সুপারিশ প্রায় চার মাসেও কার্যকর হয়নি।

পুলিশের অনুসন্ধান কমিটি জেনেছে, মানবপাচারের ক্ষেত্রে টাকা লেনদেন হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। ২৬ জন হুন্ডি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে অর্থ পাচার হচ্ছে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ১ নম্বরে আছেন টেকনাফ-উখিয়া আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠজন মং মং সেন (৪২)। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সদস্য এবং দেশীয় পাচারকারীদের বেশির ভাগ সদস্যের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায়। অনুসন্ধান কমিটি আরো জেনেছে, পাচারকারীদের বেশির ভাগই ওই এলাকায় স্থানীয়ভাবে সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং এই কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজে তাঁদের আইনের আওতায় আনার সাহস পাচ্ছে না। পাচারকারীদের তালিকায় নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হলেও রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করেনি অনুসন্ধান কমিটি।

মানবপাচারের মতো জঘন্য ও ঘৃণ্য কাজে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম। তিনি বলেন, ‘মানব পাচারকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। মানব পাচারকারীদের সরকারি দলের নেতা কিংবা নেতার স্বজন আখ্যায়িত না করে পাচারকারী হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত।’

মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে অনুসন্ধান চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘কমিটির দায়িত্ব ছিল মানবপাচার বিষয়ে অনুসন্ধান করা। কমিটি বিস্তারিত অনুসন্ধান শেষে আট দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছে। পরবর্তী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবে পুলিশ সদর দপ্তর।’

মানব পাচাকারীদের আইনের আওতায় আনতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্থল এবং জলপথে পুলিশ ও কোস্টগার্ড নিরলসভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে অনেক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষকেও এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’

অনুসন্ধান কমিটির তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে- থাইল্যান্ডের থাংশুর ছেলে মং, একই দেশের ফুডাবা জেলার রোনাং থানার চের ছেলে থেন, মিয়ানমারের চট্ট জেলার চট্টবারপাড়ার আবদুল মাবুদের ছেলে আবদুল গফুর। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ থানার মিস্ত্রিপাড়ার জলিলুর রহমানের ছেলে আবদুল আমিন (৩৫), একই গ্রামের ফজল হকের ছেলে আক্তার হোসেন মাঝি (৩৩), শাহপরীর দ্বীপের মৃত সুলতান আহাম্মদের ছেলে মো. আবু তৈয়ব (৩০) ও দিল মোহাম্মদ (৩০), দক্ষিণ নয়াপাড়ার আবদুল হাশিমের ছেলে আনার আলী (৪৫), রঙ্গীখালীর দুধু মিয়ার ছেলে সলিমউল্যাহ (৩৫), উখিয়া থানার থাইনখালী গ্রামের মৌলানা আবদুল করিমের ছেলে মো. সুমন (৩০) এবং থাইল্যান্ডে বসবাসরত মালয়েশিয়ান নাগরিক মানাকিং নামের এক মহিলা।

মানবপাচারের টাকা লেনদেনকারী হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে- টেকনাফের মং মং সেন (৪২), টেকনাফ পৌরসভার ডেইপাড়ার মো. আলীর তিন ছেলে নূরুল আমিন (৩৫), নূরুল আমিন (৪০) ও আবদুল আমিন (৩০)। লামা বাজারের আবদুল জলিল ওরফে হুন্ডি জলিল, আবদুল জলিলের ছেলে মো. ইসমাইল (২৯), বাজারপাড়ার হাজি আলী হোসেনের ছেলে মো. আইয়ুব ওরফে বাট্টা আয়ুব (৬৫) ও মোহাম্মদ ইউনুছ (৩৮), জালিয়াপাড়ার মৃত মো. হোসেনের ছেলে জাফর আলম ওরফে টিপি জাফর, মো. শাহজাহানের ছেলে জাফর সাদেক (৩০), মৃত আবু শামা ওরফে বাড়ু হাজির ছেলে হেলাল উদ্দিন (৩৫), শাহপরীর দ্বীপের ইমাম শরীফের ছেলে মো. ফাইসাল (৩০), রহিম উল্লাহর ছেলে আবদুল্লাহ (৩০), মৃত নবী হোসেনের ছেলে মো. জামাল (২৮), আছারবনিয়া গ্রামের মৃত হাজি হাকিম আলীর ছেলে মো. হারুন (৪৫), সিকদারপাড়ার মুচা আলীর ছেলে আবদুস শুক্কুর (৩০), চৌধুরীপাড়ার মো. ইসমাইলের ছেলে মো. ইসলাম (৩৩), পৌরসভার বাসস্টেশন এলাকার মুদি দোকানদার হামিদ হোসেন (৩৬), আচারবনিয়া গ্রামের বেচা আলীর ছেলে মুফিজুর রহমান (৪২), আল জামিয়া মাদ্রাসার সামনে ফার্মেসি দোকানদার আবু বক্কর (৩৮), কুলালপাড়ার শমসুল হুদার ছেলে নূরুল আবছার (২৮), ঢাকার গুলশান নিকেতনের বাসিন্দা ল্যাড়া জহিরের ছেলে জুবাইর হোসেন, চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকার বাসিন্দা ইসলাম ও কক্সবাজারের নূরুল ইসলামের ছেলে আবদুল্লাহ।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।