৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ২০ মাঘ, ১৪২৯ | ১১ রজব, ১৪৪৪


শিরোনাম
  ●  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানোন্নয়নে কক্সবাজার পৌর এলাকায় চলছে দরিদ্রবান্ধব নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কাজ   ●  পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে নিষিদ্ধ পলিথিন, হাইড্রোলিক হর্ণ জব্দ, জরিমানা   ●  বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদের নেতা   ●  হাতের কব্জির রগ কেটে মোবাইল-ল্যাপটপ ছিনতাই   ●  কক্সবাজারে ইয়াবার মামলায় ৮ রোহিঙ্গার যাবজ্জীবন   ●  লোহাগাড়ায় পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে ‘পেট্রোলের আগুনে’ পুড়িয়ে মারার চেষ্টা!   ●  চকরিয়ার সাহারবিলে সড়ক উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন করলেন এমপি জাফর আলম   ●  রাইজিংবিডির বর্ষাসেরা প্রতিবেদক তারেককে আরইউসির শুভেচ্ছা   ●  স্ট্রীটফুড ও ড্রাই ফিস প্রশিক্ষাণার্থীদের মধ্যে সার্টিফিকেট বিতরণ ও সাপোর্ট প্রদান   ●  রামুতে দুই শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে পেল স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ

বিশ্বকাপ তুমি কার

বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই গ্র্যান্ড ফাইনাল। মেলবোর্নের সেই গ্র্যান্ড ফাইনালে আজ মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড। তাসমান সাগর পাড়ের দুই দেশ। যারা আবার যৌথভাবে বিশ্বকাপের স্বাগতিকও। ফাইনালে আসল স্বাগতিক অবশ্য অস্ট্রেলিয়া। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি) তো তাদেরই মাঠ। বিশ্বকাপটাও কি তাদের হবে? না প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে তাসমান সাগর পাড়ি দিয়ে ঘরে ফিরবেন কিউইরা। সেই উত্তরের রহস্যময়তা নিয়ে চূড়ান্ত নাটকের অপেক্ষায় আজ এমসিজি। অপেক্ষায় গোটা ক্রিকেট দুনিয়াও।

মনে হচ্ছিল চিরন্তন আত্মিক বন্ধনের শুভ মুহূর্ত। নতুন স্বপ্ন, আশা, আনন্দ সঞ্জীবিত করে তুলেছিল তাদের দু’জনকেই। এমসিজির সবুজোদ্যানে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ট্রফি স্পর্শ করেছিলেন দুই অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক আর ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম; কিন্তু সেটা কেবলই ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার জন্য। ভেতরে ভেতরে স্নায়ুর চোরা লড়াই শুরু হয়ে গেছে অসি আর কিউইদের মধ্যে। অবিশ্বাস আর বঞ্চনার একটা জীবন্ত ক্ষোভ আছে কিউইদের। বড় প্রতিবেশী হয়েও গত ছয় বছরে তাদের খেলতে ডাকেনি অস্ট্রেলিয়া।

সাতাশ বছর হলো মযার্দার বক্স ইন টেস্টে উপেক্ষা করেছে অসিরা। ‘ছোট ভাই’ বললেও নিউজিল্যান্ডের ওপর অসিদেরও একটি প্রতিশোধের ব্যাপার কাজ করছে। এবারই তো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ১৫১ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল তারা। সুযোগ পেলেই অসিদের সেই খোঁচা দিচ্ছে কিউইরা। সৌজন্য, সৌন্দর্যের মাঝেও দুই দলের এই টানাপড়েনের আঁচ হয়তো বঙ্গোপসাগর কিংবা ভারত মহাসাগর পাড় থেকে পাওয়া যাবে না, যুযুধান দুই প্রতিবেশীর এই ফাইনাল ঘিরে তাসমান কিন্তু উত্তাল! বিশ্বক্রিকেটের আগামী সাম্রাজ্য কার হবে?

নতুনকে বরণ করে নেবে ক্রিকেট, নাকি অস্ট্রেলিয়াকে তার স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে দিয়ে পঞ্চমবারের মতো মুকুট তুলে দেবে সে। অনাগত শুভ মুহূর্তের কল্পনায় মেলবোর্ন কিন্তু শিহরিত। ‘আমরাই জিতব, ভালো খেলে আমরা নিউজিল্যান্ডকে হারাব’- ধপ করে জ্বলে ওঠার মতোই ‘কে জিতবে?’ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন কাল মাইকেল ক্লার্ক। অথচ যাকে এ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আগ্রাসী অধিনায়ক বলা হচ্ছে সেই ম্যাককুলাম কিন্তু মুচকি হেসে বলেছেন- ‘মানলাম আমরা আন্ডারডগ, আন্ডারডগ হয়েই মাঠে নামব। কখনও কখনও আন্ডারডগও কামড় বসিয়ে দিতে পারে ফেভারিটদের।’

ফাইনাল ঘিরে মানসিক চাপকে কৌশলেই বাইরে ঠেলে দিতে চাইছেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ম্যাককুলাম। এখানকার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কাল সারাদিন ধরে এমসিজির ফাইনালের খবর। ফক্স চ্যানেলে সারাক্ষণ অস্ট্রেলিয়ার পুরনো সব বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখানো হচ্ছে। বলতে অসুবিধা নেই, সেগুলো সেই সব ম্যাচ, যেগুলোতে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা গেল দুই বিশেষজ্ঞ বসে ফাইনাল নিয়ে আলোচনা করছেন। যেখানে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে একজনের যুক্তি, ছয়বার ফাইনাল খেলে যে দল চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়, তারা জানে কীভাবে বিশ্বকাপ জিততে হয়। পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন অন্যজন- ফাইনালে দু’বার তো হেরেছে অস্ট্রেলিয়া, সেটা তৃতীয়বার কেন হতে পারবে না।

যে শহরে কোয়ার্টার ফাইনালেও ক্রিকেট ঘিরে হেলদোল দেখা যায়নি, সেখানেই কি-না ফাইনাল ঘিরে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের এক বয়স্ক সদস্য বলছিলেন- ফাইনালটা হচ্ছে এশিয়াবিহীন। এতদিন বিশ্বকাপে এশিয়ার দাপটে স্থানীয়রাও চুপ করে ছিল। এবার তো ফাইনাল হচ্ছে ‘ভাইয়ে ভাইয়ে’ ! হ্যাঁ, অসিরা কিউদের ছোট ভাই-ই মনে করে থাকে। তবে দুই ভাইয়ের মধ্যেও সম্পর্কটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। নিউজিল্যান্ডের আপেলে কী এক পোকা দেখায় গত সাত বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া তা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।

সব ক্ষোভ যেন আজ এমসিজিতে বিস্ফোরিত করতে চান কিউইরা। বিশ্বকাপের সব ম্যাচ জিতেই মেলবোর্নে ফাইনাল খেলতে এসেছেন ম্যাককুলামরা। গত ছয় সপ্তাহর গ্রাফটাই তাই কিউদের বড় শক্তি। দারুণ ফর্মে আছেন কিউই অধিনায়ক ম্যাককুলাম।

আগের ম্যাচে ২৬ বলে ৫৯ রান তুলে জয়ের ভিত গড়ে দেন। অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলার মিচেল জনসনের বিপক্ষে মার্টিন গাপটিল আর ম্যাককুলাম জুটির ২০৮ রান আছে ওয়ানডেতে। এ পর্যন্ত ওয়ানডেতে জনসনের ১০২টি বল খেলে ম্যাককুলাম করেছে ১১৩ রান। তাই অসি পেসের সামনে ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই ম্যাককুলামের। প্রথম পাওয়ার প্লের পুরো সুবিধা তিনি আদায় করে নিতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গাপটিলের ৯টি হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে। ছন্দে আছেন রস টেলরও, নিউজিল্যান্ড দলে তাকে ধরা হয় বড় ম্যাচের ক্রিকেটার হিসেবে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৪ রানের একটা ইনিংস আছে তার।

তবে বর্তমান অস্ট্রেলিয়ান দলের বোলারদের বিপক্ষে তার ব্যাটিং গড় মাত্র ১৬.১৭। তবে নিউজিল্যান্ডের পাঁচ নম্বরে নির্ভরযোগ্য একটি জায়গায় দারুণ একজনকে পেয়েছে। গ্রান্ট এলিয়ট, শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে ফাইনালের টিকিট এনে দিয়েছেন। সেদিন তার ৭৩ বলে ৮৪ রানের ইনিংসটিকে বলা হয় নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সৌভাগ্যের ইনিংস। এদিনও তাকে দেখা গেল এমসিজির নেটে স্ট্রেট শট খেলতে। ব্যাটিং শক্তির পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের বোলিংয়েও কিন্তু বৈচিত্র্য আছে। ঘণ্টায় একশ’ চলি্লশ কিলোমিটার গতিতে বল ছোটাচ্ছেন টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্টের সুইংও ভোগাচ্ছে প্রতিপক্ষকে। তবে একজন কিন্তু নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ড্যানিয়েল ভেট্টরি। অভিজ্ঞতায় অন্তত তাকে ছুঁতে পারছেন না কেউ।

অস্ট্রেলিয়া থেকে কলার উঁচু করে কেউ ট্রফি জিতে নিয়ে যাবে, এটা অন্তত ক্লার্ক মানতে পারছেন না। তার ওয়ানডে ক্রিকেটের শেষ দিনটা স্মরণীয় করে রাখতে চান বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেই। তা ছাড়া নিজেদের মাঠে অসিরা সব সময়ই ফেভারিট। এ মাঠেই কিউইদের বিপক্ষে ১৮টি ম্যাচ খেলে জিতেছে ১৪টিতে। এ মাঠেই টানা ছয়টি ওয়ানডে জেতা আছে ক্লার্কদের। পরিসংখ্যান আরও আছে, এই মাঠে অসি ওপেনার অ্যারন ফিঞ্চের গড় ৬৫.৬১! স্টিভেন স্মিথ তার সর্বশেষ ১৯ ওয়ানডের দশটিতেই পঞ্চাশের ওপর রান তুলেছেন। অসি ব্যাটিং লাইনআপ এখন এতটাই শক্তিশালী যে, মাইকেল ক্লার্ককে নামতে হচ্ছে ছয় নম্বরে। গতকাল মজা করেই তাকে বলা হয়েছিল- দলের সবচেয়ে ভালো ব্যাটস্যান কেন ছয় নম্বরে ব্যাটিং করতে নামে? রসিকতাটা প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে হেসেই বলেছিলেন- দলের প্রয়োজনে আমাকে যদি ব্যাটিং নাও করতে হয় তাহলেও আমি খুশি।

ক্লার্ক সত্যিই খুশি হবেন যদি আজ তিনি বিশ্বকাপ ট্রফিটি স্পর্শ করতে পারেন। কারণ এ দিনই শেষবারের মতো তিনি অস্ট্রেলিয়ার রঙিন জার্সি গায়ে জড়িয়ে নামবেন। এক অসি সাংবাদিক জানাচ্ছিলেন স্মিথ, জনসনরা নাকি ঠিক করে রেখেছেন, আজ তারা ট্রফি জিতলে ক্লার্ককে কাঁধে নিয়ে মাঠ ঘুরবেন। ওই যে যেমনটা করেছিলেন গতবার যুবরাজরা শচীনকে মাথায় নিয়ে। দলের কোনো শ্রদ্বেয়জনকে এর চেয়ে ভালোভাবে বিদায় দেওয়ার সুযোগ বোধহয় আর হয় না। আর তাই কিউই শিবিরেও কান পেতে শোনা খবর, সেখানেও নাকি ড্যানিয়েল ভেট্টরির বিদায়টা বিশ্বকাপ ট্রফি দিয়েই সারতে চান ম্যাককুলামরা।

বিশ্বকাপ জেতার পর দু’দলেরই সেলিব্রেশন মেন্যু ঠিক হয়ে গেছে। সমর্থকরাও তৈরি হয়ে আছে, মেলবোর্নের ইয়ারা নদীর পাড়ে কিউই সমর্থকরা গতকাল অনেক রাত অবধি গানবাজনা করেছে। ছুটি দিনে অসিরাও প্রস্তুত। ফেডারেশন স্কয়ারে আতশবাজির মঞ্চও তৈরি আ?েছ, এখন সেই বাজির সলতে তো শুধু আগুন ছোঁয়ানোর অপেক্ষা। সেই স্ফুলিঙ্গ কি জনসনের গতিতে হবে, নাকি ম্যাককুলামের কভার ড্রাইভে? সাউদির সুইংয়ে, নাকি ম্যাক্সওয়েলের স্লগ সুইপে? শুধু তাসমান নয়, সেটা দেখার জন্য বসে থাকবে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব।

এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।